বন্দে মাতরম — শ্লোক ও সহজ বাংলা অর্থ –

Vande Mataram sloka and Bengali meaning banner with Bankim Chandra Chattopadhyay's portrait and Bharat Mata

রামপদ আচার্য্যের কলমে

🇮🇳 “বন্দে মাতরম” কেবল একটি দেশাত্মবোধক গান নয়। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব উপলব্ধি থেকে আমি বিশ্বাস করি, এটি আমাদের মাতৃভূমির চিরন্তন রূপ, অপরিসীম শক্তি, জ্ঞান, প্রাচুর্য এবং আত্মমর্যাদার এক অনন্য কাব্যিক দলিল।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত এই অমর সৃষ্টি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় লাখো মুক্তিকামীর অন্তরে সাহস ও প্রেরণার সঞ্চার করেছিল। তাই এর প্রতিটি স্তবকের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে হলে শব্দের পাশাপাশি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মূল ভাবধারাকে জানা একান্ত জরুরি।

“বন্দে মাতরম”-এর রচনা, প্রকাশ, স্বাধীনতা আন্দোলনে এর ভূমিকা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে Government of India-এর Vande Mataram-এর 150 বছরের ঐতিহাসিক বিবরণ দেখা যেতে পারে।


১. সুজলা-সুফলা মাতৃভূমি

শ্লোক:

বন্দে মাতরম্।
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং,
শস্যশ্যামলাং মাতরম্।

  • সহজ বাংলা অর্থ:হে মাতৃভূমি, আমি তোমাকে শ্রদ্ধাভরে বন্দনা করি। তুমি নির্মল জলে পরিপূর্ণ এবং সুস্বাদু ফলে সমৃদ্ধ। তোমার কোল জুড়ে বয়ে যায় চন্দন-শীতল সুগন্ধি সমীরণ। তোমার মাঠ-প্রান্তর চিরসবুজ শস্যে শ্যামল।
  • অন্তর্নিহিত ভাব:প্রথম স্তবকে ভারতের সমৃদ্ধ ভৌগোলিক পরিবেশ এবং উর্বর কৃষিজীবনের নিটোল চিত্র ফুটে উঠেছে। এখানে দেশকে জীবনদায়িনী স্নেহময়ী মা হিসেবে বরণ করা হয়েছে।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭-এর গণপরিষদ অধিবেশনে “বন্দে মাতরম”-এর প্রথম স্তবক গাওয়া হয়েছিল; সেই ঐতিহাসিক ঘটনার নথি Constituent Assembly Debates-এর 14 August 1947 record থেকে দেখা যেতে পারে।


২. চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল জননী

শ্লোক:

শুভ্রজ্যোৎস্না পুলকিত যামিনীম্,
ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদলশোভিনীম্,
সুহাসিনীম্ সুমধুর ভাষিণীম্,
সুখদাং বরদাং মাতরম্।

  • সহজ বাংলা অর্থ:হে জননী, তোমার রাত্রি চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় উদ্ভাসিত। তোমার বনভূমি প্রস্ফুটিত পুষ্পরাজি ও বৃক্ষলতায় সজ্জিত। তোমার হাসি অত্যন্ত সুন্দর এবং কণ্ঠস্বর মধুর। তুমি সকল সন্তানকে সুখ ও কল্যাণময় আশীর্বাদ দান করো।
  • অন্তর্নিহিত ভাব:এখানে মাতৃভূমির শান্ত, স্নিগ্ধ ও রূপময় সত্তাকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষার মাধুর্য এই চরণে প্রতিফলিত।

১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদে “বন্দে মাতরম”-এর মর্যাদা সম্পর্কে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের ঐতিহাসিক বক্তব্যটি Constituent Assembly of India-এর মূল নথিতে পড়া যায়।


৩. মাতৃভূমির মহাশক্তি ও প্রতিরোধ

শ্লোক:

কোটি কোটি কণ্ঠে কলকল নিনাদ করালে,
কোটি কোটি ভুজে ধৃত খরকরবালে,
কে বলে মা তুমি অবলে?
বহুবলধারিণীং নমামি তারিণীং,
রিপুদলবারিণীং মাতরম্।

  • সহজ বাংলা অর্থ:কোটি কোটি কণ্ঠের গর্জন যার ধ্বনি, কোটি কোটি হস্তে ধারালো তলোয়ার যার সুরক্ষায় প্রস্তুত—সেই জননীকে কে অবলা বা দুর্বল বলতে পারে? হে মা, তুমি অপার শক্তির অধিকারী। তুমি সঙ্কট থেকে উদ্ধার করো এবং শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করার সাহস জোগাও।
  • অন্তর্নিহিত ভাব:মাতৃভূমি কখনোই দুর্বল নয়। দেশবাসীর সম্মিলিত শক্তি ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই দেশের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মূল “Vande Mataram” এবং শ্রী অরবিন্দের ইংরেজি অনুবাদ একসঙ্গে পড়তে চাইলে Wikisource-এ সংরক্ষিত Vande Mataram-এর মূল পাঠ ও অনুবাদ দেখা যেতে পারে।


৪. জ্ঞান, আদর্শ ও অন্তরের ভক্তি

শ্লোক:

তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম,
তুমি হৃদি, তুমি মর্ম,
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।
বাহুতে তুমি মা শক্তি,
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি,
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।

  • সহজ বাংলা অর্থ:হে মা, তুমি আমাদের বিদ্যা, নীতি, অন্তর্নিহিত চেতনা ও প্রাণবায়ু। আমাদের কর্মশক্তি তোমার দান এবং হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধাও তোমারই চরণে সমর্পিত। প্রতিটি হৃদয়ের উপাসনাস্থলে তোমারই রূপ বিরাজমান।
  • অন্তর্নিহিত ভাব:এই স্তবকের “ধর্ম” শব্দটি সংকীর্ণ কোনো মতাদর্শ নয়; বরং ন্যায়পরায়ণতা, কর্তব্যবোধ, নৈতিক চরিত্র এবং আত্মিক উন্নতির সমষ্টিগত প্রকাশ।

হিন্দু দর্শনে ধর্ম বলতে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, ন্যায়, কর্তব্য ও আদর্শ জীবনযাপনকেও বোঝানো হয়; এই ভাবটি আরও উপলব্ধি করতে Shree Ram Chalisa ও Dharma-র আধ্যাত্মিক শিক্ষা সম্পর্কিত লেখাটি পড়তে পারেন।


৫. শক্তি, প্রাচুর্য ও বিদ্যার সমন্বয়

শ্লোক:

ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী,
কমলা কমলদলবিহারিণী,
বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাম্।
নমামি কমলাং অমলাং অতুলাং,
সুজলাং সুফলাং মাতরম্।

  • সহজ বাংলা অর্থ:হে মাতৃভূমি, তুমি সুরক্ষাদায়িনী শক্তিরূপে দুর্গা, সৌভাগ্য ও প্রাচুর্যের প্রতীক রূপে লক্ষ্মী (কমলা), এবং জ্ঞানের আধার রূপে সরস্বতী (বাণী)। তুমি নিখাদ, অতুলনীয়, সুজলা ও সুফলা—তোমাকে সতত প্রণাম জানাই।

দুর্গার শক্তি, সাহস ও রক্ষাকারী ভাব সম্পর্কে আরও জানতে Durga Chalisa-এর অর্থ ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য পড়তে পারেন।

লক্ষ্মীকে সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য এবং কল্যাণের প্রতীক হিসেবে কীভাবে দেখা হয়, তা বিস্তারিত জানতে Maa Lakshmi Chalisa বিষয়ক লেখাটিও পড়তে পারেন।


ঐতিহাসিক ও কাব্যিক প্রেক্ষিত

এই স্তবকে ব্যবহৃত রূপকগুলো মূলত একটি জাতির তিনটি অপরিহার্য স্তম্ভকে নির্দেশ করে:

  • দুর্গা: জাতির সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষামূলক শক্তি।
  • লক্ষ্মী: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য।
  • সরস্বতী: প্রজ্ঞা, শিল্প ও বিদ্যাচর্চা।

ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা সমাজে থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসকে মর্যাদা দিয়েই ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রকৃত দেশপ্রেমের মূল নীতি।

“আনন্দমঠ”, বঙ্কিমচন্দ্র এবং “বন্দে মাতরম”-এর সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আরও গভীরভাবে বুঝতে University of Delhi-এর Anandamath academic study পড়া যেতে পারে।


৬. লালন-পালনকারী চিরন্তন ধরিত্রী

শ্লোক:

শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাং,
ধরণীং ভরণীং মাতরম্।

  • সহজ বাংলা অর্থ:হে মা, তুমি শ্যামবর্ণা, সরল ও নির্মল হাস্যে শোভিত। তুমি সমগ্র সন্তানকে বক্ষে ধারণ করে পরম মমতায় লালন-পালন করো।
  • অন্তর্নিহিত ভাব:দেশের ভূমি আমাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও আশ্রয় দেয়। এই অনন্ত কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই মাতৃপূজার সূচনা।

স্বাধীনতা আন্দোলনে বন্দে মাতরমের ঐতিহাসিক ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে “বন্দে মাতরম” ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার সিংহনাদ। ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে এই মহামন্ত্র ফাঁসির মঞ্চেও বিপ্লবীদের মনে নির্ভীক সাহস জুগিয়েছিল। এটি কেবল একটি গান নয়, একটি জাতির জাগরণ ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

পবিত্র বা অর্থবহ শব্দের মনোযোগসহ পুনরাবৃত্তি মানুষের মনকে কীভাবে স্থির ও কেন্দ্রীভূত করতে পারে, সেই পৃথক বিষয়টি জানতে মন্ত্রজপ ও মানসিক শান্তি নিয়ে আমার বিস্তারিত লেখাটি পড়তে পারেন।


রামপদ আচার্য্যের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলব্ধি

আমার দৃষ্টিতে, “বন্দে মাতরম” গানটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন বাক্য দিয়ে বিচার করা সংগত নয়। সাহিত্যিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক অবদান এবং তৎকালীন মুক্তিপিপাসু মনের আকুতিকে একত্রে অনুভব করলেই এর যথার্থ তাৎপর্য স্পষ্ট হয়।

দেশপ্রেম হলো সর্বজনীন। এটি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। নিজের বিশ্বাসে অবিচল থাকার পাশাপাশি অপরের বিশ্বাস, মর্যাদা ও মানবিক অধিকারকে সম্মান করাই সুস্থ সমাজের পরিচয়। মাতৃভূমির সেবা ও সমাজকল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই হোক আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য।

ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে দৈনন্দিন শৃঙ্খলা ও কৃতজ্ঞতাকে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তার একটি সহজ উদাহরণ জানতে Morning Puja Vidhi Guide পড়তে পারেন।


বন্দে মাতরম সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. বন্দে মাতরম কে রচনা করেছিলেন?

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭০-এর দশকে এটি রচনা করেন এবং পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ-এ অন্তর্ভুক্ত করেন।

২. বন্দে মাতরম শব্দের অর্থ কী?

এর আক্ষরিক ও গভীর অর্থ হলো—“মা (মাতৃভূমি), আমি তোমাকে বন্দনা করি বা প্রণাম জানাই।”

৩. বন্দে মাতরম কি ভারতের জাতীয় সংগীত?

না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “জন গণ মন” হলো ভারতের জাতীয় সংগীত (National Anthem)। অন্যদিকে “বন্দে মাতরম” ভারতের জাতীয় গান (National Song) হিসেবে সমমর্যাদায় স্বীকৃত।

৪. গানে বিভিন্ন রূপকের প্রয়োগ কেন করা হয়েছে?

কাব্যিক ভাষায় শক্তি, সমৃদ্ধি এবং বিদ্যার মতো জাতির মৌলিক গুণাবলিকে প্রকাশ করতেই এই উপমাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।

৫. বন্দে মাতরমের মূল বার্তা কী?

মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতি দায়বদ্ধতা গড়ে তোলাই এর মূল শিক্ষা।

দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও সাহিত্যচেতনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো এই অমর সৃষ্টি।

বন্দে মাতরম্।

🇮🇳 বন্দে মাতরম।


Connect with the Best in Kolkata

Stop wandering in uncertainty. Your stars have a story to tell, and Ramapada Acharjee is here to help you read it. With a legacy built on truth, 35 years of experience, and a mission to bring peace to every household, your journey toward clarity starts here.

📍Consultation available in Kolkata, Guwahati, Siliguri, Tarapith & online.
📞 Call/WhatsApp: +91-98749 54063
🌐 Visit Website


You May Also Read

🔗 Related Category: Hindu Rituals
🔗 Related Category: blog

Ramapada Acharjee

Ramapada Acharjee: Professional Astrologer, Tantra & Palmistry Consultant. With a distinguished career spanning over 35 years, I have been practising astrology since 1991 and working full-time independently since 1996. This expertise is a profound family legacy passed down through generations; my father was a pioneer in the field, establishing the first-ever astrological counselling centre within Kolkata's renowned jewellery industry at M.P. Jewellers on Vivekananda Road. Our deep-rooted heritage from Noakhali has always guided our commitment to this science. While some may question the professional status of astrology, I uphold our family’s credibility with my father’s 1952 passport, which officially recognised "astrology" as his profession by the central government over seven decades ago. Combining insights from ancient scripts and Vedic manuscripts with decades of practical experience, I am dedicated to providing authentic guidance and spiritual solutions to clients worldwide.

Scroll to Top